লালনের এই গানটা আগে তেমন করে শুনিনি। বল রে বলাই, তোদের ধরন কেমন হা রে! গোষ্ঠগান। আখড়ার উত্তরে আমগাছের তলে ঘুরে ঘুরে এক তরুণ সাধু আপন মনে গেয়ে চলেছে। নেচে নেচে। একতারা হাতে। বল রে বলাই, তোদের ধরন কেমন হা রে! তোরা সব বলিস রাখাল ঈশ্বর, এই গোপালকে মানিস কই রে!
জীবনের কত সকাল-সন্ধ্যা আখড়ার ঘাসে শুয়ে, আকাশ দেখে, একতারা শুনে শুনে পেরিয়ে গেছে। কিন্তু গানটা খুব বেশি শোনা হয়নি তো! সাধু প্রথম চরণটুকুই টানা গেয়ে চলেছে। ভীষণ ঘোরের মধ্যে আছে, দেখতে পাচ্ছি। মাঝে মধ্যে তাল কেটে যাচ্ছে। একেবারেই বেখেয়াল।
মূল মাজারের পূর্ব দেয়ালের লাগোয়া নারকেল গাছটা কবে যেন মরে গেছে। গোড়ার পচা অংশটুকু শেষ অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তারি চারপাশে গোল করে বাঁধানো শান। টাইলসে মোড়া। ডিসেম্বরের সকালে মিষ্টি রোদে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছি। এরই মধ্যে সাধুর করুণ সুর। বল রে বলাই, তোদের ধরন কেমন হা রে!
২
লালনের বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে গোষ্ঠগান খুবই ছোট একটি ধারা। মাত্র আটটি গান তিনি লিখেছেন। অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি, গোষ্ঠে চলো হরিমুরারি লয়ে গোধন, গোষ্ঠে আর যাবো না মাগো, ও মা যশোদে তায় আর বললে কি হবে, সকালে যাই ধেনু লয়ে, বনে এসে হারালাম কানাই, কোথা গেলি ও ভাই কানাই, এবং বল রে বলাই তোদের ধরন কেমন। লালনের নানান পরম্পরা ধারাটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
গোষ্ঠগান মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণ-কীর্তন ঘরানার একটি সংযোজন। এখানে কৃষ্ণকে বলাই, নিমাই, কানাই, গোপী, গোষ্ঠ, গোপাল এমন নানা নামে ডাকা হয়েছে। কৃষ্ণ নিঃসন্দেহে স্বয়ং ঈশ্বর। তার গোচারণ বা গোষ্ঠলীলার তত্ত্বকথা গোষ্ঠগানের মূল উপজীব্য। লালনের গানের অতি ফিউশনের তাণ্ডবে এ ধারা আজ লুপ্তপ্রায় এবং এর চর্চাও অনুপস্থিত। প্রকৃত সাধুরা নিজেদের জন্য আপন খেয়ালে কখনো সখনো এগুলো গেয়ে থাকেন। খুব ভোরে। প্রার্থনা সঙ্গীত হিসেবে।
৩
একসময় তরুণ সাধুর গান শেষ হয়। বল রে বলাই, তোদের ধরন কেমন হা রে! আমি তাকে গভীর মনোযোগে শুনছি, আখড়ার এই সাত সকালের নির্জনে, সে লক্ষ্য করে। ইশারায় বসতে বলি, পাশে শানের উপর। অল্প বয়সী সন্ন্যাসী। ২০-২১ এর বেশি নয় নিশ্চিত। আজানুলম্বিত জটা-জুটো। ময়লা হাড্ডিসার অভুক্ত দেহ।
সাধু, নাম কি তোমার? খাতির জমানোর চেষ্টা করি।
কী এসে যায় নামে, বলো! পাল্টা প্রশ্ন করে বসে সে। যে নামে ইচ্ছে ডাকো। তোমার নামেই না হয় ডাকো!
আমার নাম তো ফারুক!
ঠিক আছে। এর সাথে একটা গোসাই জুড়ে দাও। কেমন হলো? হাহাহা।
‘কল মি বাই ইয়োর নেইম’ নামে খুব আপত্তিকর একটা সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল। ইতালীয় সিনেমা। ১৯১৮ সালে অস্কার পেয়েছিল।
সাধুর দিকে মনোযোগ দিই। সাঁইজির সাধনায় যারা জীবন উৎসর্গ করে, তাদের চোখের দিকে তাকানো ভীষণ কঠিন। ভেতরে জীবন্ত অগ্নিগিরি। একবারে ভষ্ম হয়ে যাবে। কিন্তু তরুণের চোখে গভীর বিষন্নতা। আর কিছু নেই।
সকালে নাস্তা করেছো? সরাসরি জিজ্ঞেস করি।
আমি সপ্তাহে একদিন খাই।
সপ্তাহে একদিন মাত্র! বিস্ময়কর তো! কবে খাও?
প্রতি বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যায়। তখন আখড়ায় শিরনি রান্না হয়। সকলের জন্য।
একদিন খেয়ে বাঁচা যায়!
নির্ভর করছে, বাঁচা বলতে তুমি কি বোঝো? আমি একটানা চৌদ্দদিন না খেয়েও দেখেছি। আরও কিছুদিন নিশ্চয় পারতাম। মনে হলো, ধুর! কী লাভ এসব করে? এ লাইনের মানুষরা সাধারণত তারছেঁড়া হয়, জানো তো? মানুষের তার থাকে ছয়টি। কারো একটা ছেঁড়া, কারো দুটো। কারো আবার ছয় তারই ছেঁড়া। দেখছো না চারদিকে! আর আছে তোমাদের মত কিছু চতুর লোক। তবে ভীষণ ভিতু। দ্বিধান্বিত। ব্রোকেন। ঘর করো সংসারে, কিন্তু ভেতরে বৈরাগ্য। তোমরা স্বপ্ন দেখো, সাঁইজি নিজের গরজে এসে পার করে নেবে। তার ছেঁড়েনি এখনো, তবে বেসুরে বাজতে শুরু করেছে। যেকোন সময় ধরা খাবে।
একথা কেন বলছো?
নইলে তুমি এই সাত সকালে সাঁইজির আখড়ায় কি করো!
আগ্রহ তৈরি হচ্ছে ক্রমশঃ।
কোথায় থাকো?
ঐ যে, ঐখানে। পেছনে সাঁইজির সমাধি স্থান। সাঁইজি ওখানে শুভ্র কনক্রিটে আচ্ছাদিত, কোরা গিলাফে সৌন্দর্য্যমন্ডিত। তাঁর সামনে প্রধান শিষ্যরা ঘুমিয়ে। বেশ ক’জন। নাম-ধাম যথাসম্ভব লিপিবদ্ধ। সাধু আঙ্গুল নির্দেশ করে সাঁইজির সমাধি গৃহের দিকে।
কোথাকার মানুষ তুমি, বলো তো?
আমি মহাশূন্য থেকে এসেছি বলতে পারো। হাহাহা। শুনেছি, পাশেই চড়ুইকোলে জন্মেছিলাম। এখন কিছু নেই।
কী বিস্ময়! আমিও তো ওখানে জন্মেছি! ছোট্ট রেলওয়ে স্টেশন। মনে আছে? সারাদিনে একটা-দুটো ট্রেন আসতো। পোঁ পোঁ…। কত যে কাঁঠাল গাছ চারদিকে! উঁচু যে ঘরটায় সিগন্যাল নামানোর সারিবদ্ধ হ্যান্ডেলগুলো, লোহার সিঁড়ি বেয়ে সেখানে উঠে যেতাম। উপরের হাফ দেয়াল বুক সমান। লাফ দিয়ে তাতে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকো যতক্ষণ ইচ্ছে। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত। হু হু বাতাস। ঠাণ্ডা। নির্জন। করুণ। আর অসংখ্য চড়ুই পাখি। কিচির মিচির…। সাঁইজির আখড়ায় এই সাত-সকালে বুকের মধ্যে হাজার চড়ুইয়ের দাপাদাপি শুরু হয়ে যায়।
কত দিন ধরে এ লাইনে আছো?
সাধারণ প্রশ্ন। বোকা লোকেরা হামেশাই করে থাকে।
নয় বছর বয়স থেকে। উত্তর আসে। ওমা! এর তো দেখি গোটা জীবনটাই সন্ন্যাস।
এখানেই থাকো?
নাহ। যখন যেখানে ভাল লাগে। ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম।
কারো কারো জন্য কখনো কখনো কেমন যেন মায়া মায়া লাগে। যেমন ঐ ক্ষুদে চড়ুইগেুলোর জন্য। যেমন এখন এই তরুণ সাধুর জন্য। সকালের নাস্তার নিমন্ত্রণ করি। আখড়ার বাইরে ছেঁউড়িয়া বাজারে অনেকগুলো খাবার রেস্তোরা আছে। সাধুরা ওখানে আহার করে। চলো, যাই।
না না। আজ সবে মঙ্গলবার। বৃহস্পতিবার এখনো অনেক দেরি।
৪
সকালের নরম সূর্য আমের পাতার ভেতর দিয়ে উষ্ণতা ঢেলে চলে। সেই নীলাভ মিষ্টি আলোয় ঘাসের ছায়ায় কুটো খোঁজায় ব্যস্ত ধূসর ছোট্ট চড়ুই দল। পৃথিবী জোড়া এই যে শীতল নৈঃশব্দ্য, কী অপার্থিব! মনে হয়, এ-ই অনন্ত জীবন। এ-ই বেঁচে থাকা। এ-ই সার্থক মানব জনম।
বল রে বলাই তোদের ধরন কেমন হা রে।
তোরা সব বলিস রাখাল ঈশ্বর
এই গোপালকে মানিস কৈ রে।
বনে যেয়ে বনফল পাও
এঁটো করে গোপালকে দাও
তোদের এ কেমন ধর্ম, বল সেই মর্ম
আজ আমারে।
গোষ্ঠে গোপাল যে দুঃখ পায়
কেঁদে কেঁদে বলে আমায়
তোরা ঈশ্বর বলিস যার, কাঁধে চড়িস তার
কোন বিচারে।
আমারে বুঝা রে বলাই
তোদের তো সে ভাব দেখি নাই
লালন বলে তার, ভাব বুঝা ভার
এ সংসারে।
রাশি রাশি চড়ুই, গাঢ় ধূসর ছোট্ট প্রিয় কোমল চড়ুই, চারপাশ নিবিড় করে ঘিরে ধরে। আস্তিনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে। তারপর ক্রমশঃ হৃদপিন্ডের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। একসময় পোড়া হৃদপিন্ড একটা জীবন্ত চড়ুইকোল হয়ে ওঠে। তারপর আপন মনে গোষ্ঠগান গাইতে গাইতে, একতারা বাজাতে বাজাতে তরুণ সাধু চড়ুইদের পিছু পিছু হৃদপিন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ে গোটা হৃদপিন্ডটাই দখল করে নেয়। তখন গোষ্ঠগান আর একতারার অমোঘ সুরে অনন্ত বন্দি হয়ে যাই। ভেতরে কেবল তরুণ সাধুর হৃদপিন্ডের মৃদু মধুর দুপ দুপ শব্দ।
সাধু সামনের পথটুকু বেয়ে এগিয়ে নিয়ে যায় মূল মাজারের দক্ষিণ খিড়কির দিকে। নিচু দেয়ালে ঘেরা সারি সারি সমাধি সেখানে। সাঁইজির প্রধান শিষ্যদের। সব শুভ্র। উন্মুক্ত। সেগুলোকে ডানে-বায়ে রেখে মূল সমাধি গৃহের ভেতরে ঢুকে পড়ি। সকালের সূর্য অবারিত ঢুকে পড়ে দেয়ালের ঘুলঘুলি দিয়ে। ঠিকরে পড়ে কোরা গিলাফে। ক্রমশঃ সাঁইজির সমাধির সামনে নতজানু হই। তারপর পুষ্পাচ্ছাদিত ভারী গিলাফ দু’হাতে উঁচিয়ে তার মধ্যে মাথা সেঁধিয়ে দিই এবং অদৃশ্য হয়ে যাই সমাধির গভীরে।























2 Responses
আর জনমে চড়াই হবো!
অন্যরকম ।